প্রকাশিত: ২ ডিসেম্বার, ২০২৫, ১২:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
উপজেলা প্রতিনিধি:
লালমনিরহাট: একসময় লালমনিরহাট জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল এলাকার শিক্ষার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিদ্যালয়সহ দেশের বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার মান, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধায়। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষ সরকারি বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন; ঝুঁকছেন বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের দিকে।
শিক্ষার্থী কমছে, অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে
স্থানীয় অভিভাবক মোঃ মাসুদ মিয়া (৩৪) জানান, একসময় ইশোরকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সন্তোষজনক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে ভর্তি কমেছে। তিনি বলেন, "কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের প্রতি যত্ন, নিয়মিত ক্লাস ও আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে ভালো। বাধ্য হয়েই আমরা সেদিকে ঝুঁকছি।"
শিক্ষক স্বল্পতা ও দুর্বল অবকাঠামোই প্রধান সমস্যা
অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মোজাম্মেল হক শিক্ষকের অপ্রতুলতাকে শিক্ষার মান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, "বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম। একজন শিক্ষককে দুই-তিনটি শ্রেণি নিতে হওয়ায় শিশুদের প্রতি পৃথক মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শেখার গতি কমছে এবং পড়ায় আগ্রহ হারাচ্ছে শিশুরা।"
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "ইশোরকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। শিশুদের কাছে পড়াশোনাকে আকর্ষণীয় করতে যে পরিবেশ প্রয়োজন, তা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত।"
আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার আধুনিকায়নের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, "সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বললেও আমাদের বিদ্যালয়ে সেই সুবিধাগুলো ব্যবহারযোগ্য নেই। পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী, কম্পিউটার ও শিক্ষা সহায়ক উপকরণের অভাব রয়েছে। অনেক সময় বিদ্যুৎ সমস্যাও শিক্ষার স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করে।"
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দুর্বল কার্যক্রম ও তদারকির অভাবও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে শিক্ষকরা জানান। তাদের মতে, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ নিশ্চিত হলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা
এলাকার মানুষ মনে করছেন, সরকারি বিদ্যালয়গুলো মানে পিছিয়ে পড়লে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ কিন্ডারগার্টেনের খরচ সব পরিবার বহন করতে পারে না। এতে সমাজে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়বে।
শিক্ষাবিদ জাহাঙ্গীর কবির এই প্রসঙ্গে বলেন, "ইশোরকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দেশের সকল প্রতিষ্ঠান আবারও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে—যদি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সরকারি বিদ্যালয় দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি; এই ভিত্তি দুর্বল হলে প্রজন্মও দুর্বল হবে। তাই এখনই সময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে নতুন করে শক্তিশালী করে তোলার।"
মন্তব্য করুন