প্রকাশিত: ২ ডিসেম্বার, ২০২৫, ১২:২৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

চাকরি নয়, অবসর জীবন কাটছে মাটির সঙ্গে বন্ধুত্বে

পাটগ্রামের সাবেক ব্যাংক ম্যানেজারের ‘মাল্টা বিপ্লব’

বিশেষ প্রতিনিধি, পাটগ্রাম, লালমনিরহাট।

ফাইলের হিসাবের খাতা থেকে ফসলের মাঠের সবুজ নিসর্গ—এই দুইয়ের মধ্যে দূরত্ব বিস্তর। কিন্তু লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার নিবাসী রফিকুল ইসলামের জীবনে এই দুই প্রান্তিকতার সফল মেলবন্ধন ঘটেছে। একসময় যিনি সোনালী ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার হিসেবে অর্থের লেনদেন সামলেছেন, আজ তিনি অবসর জীবনে দুই একর জমিতে মাল্টা চাষ করে নিজেই সবুজ বিপ্লবের’ প্রতীক হয়ে উঠেছেন। চার বছর আগে শখের বশে শুরু করা এই উদ্যোগ থেকে তিনি এখন প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, যা কেবল তার পারিবারিক অর্থনৈতিক চিত্রই পাল্টায়নি, বদলে দিয়েছে এলাকার কৃষির প্রতি মানুষের চিরাচরিত ধারণা।

কর্মজীবন শেষে মাটির মায়া

পাটগ্রামের মাটি ও মানুষের সঙ্গে রফিকুল ইসলামের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে ব্যাংক থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি কেন কৃষি বেছে নিলেন—এই প্রশ্নের জবাবে তার কণ্ঠে ছিল এক দার্শনিক সুর।

তিনি বলেন, "দীর্ঘদিন মানুষের অর্থনৈতিক হিসাব কষতে কষতে একঘেয়েমি এসেছিল। অবসরের পর মনে হলো, এবার প্রকৃতির হিসাব কষি। ব্যাংকে থাকাকালে শুনেছিলাম মাল্টা চাষ বেশ সম্ভাবনাময়। নিজের দুই একর জমি পতিত ছিল। ভাবলাম, শেষ জীবনে শখের বশে কিছু একটা করি। সেই শখই যে আজ আমার সোনালী’ স্বপ্ন পূরণ করবে, তা ভাবিনি।"

আজ থেকে চার বছর আগে, নিছক শখের বশে শুরু হয়েছিল তার এই যাত্রা। স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে তিনি উন্নত জাতের মাল্টার চারা সংগ্রহ করেন এবং দুই একর জমিতে সারিবদ্ধভাবে তা রোপণ করেন। পেশাদার জীবনের মতোই নিখুঁত পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম ছিল তার এই নতুন উদ্যোগের মূলধন।

ফলের ক্যানভাসে লাখ টাকার আয়

রফিকুল ইসলামের বাগানে প্রবেশ করলেই দেখা যায় সারি সারি সবুজ গাছ, যার প্রতিটিতে ঝুলছে কাঁচা-পাকা মাল্টার সোনালী আভা। এটি কেবল একটি বাগান নয়, যেন সবুজ ও সোনালীর এক জীবন্ত ক্যানভাস।

মাল্টা চাষের প্রথম দুই বছর পরিচর্যা ও অপেক্ষার পালা চললেও, তৃতীয় বছর থেকে শুরু হয় ফলন। আর চতুর্থ বছরে এসে ফলন দাঁড়ায় ‘আশ্চর্যজনক’ পর্যায়ে। প্রতি একরে ফলন এবং বাজারে মাল্টার চাহিদা তাকে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "প্রথম বছর ফলন কম হলেও বাজারের দাম ছিল চমৎকার। কিন্তু এ বছর ফলন এত ভালো হয়েছে যে, স্থানীয় পাইকাররা বাগান থেকেই ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। হিসাব করে দেখেছি, দুই একর জমি থেকে এ বছর আমার মোট আয় প্রায় ৮-লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এটি আমার শেষ জীবনের জন্য সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ।"

রফিকুল ইসলামের কৃষি-দর্শন: পরিকল্পনা, নিষ্ঠা ধৈর্য

তার এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনের রহস্য কী? জানতে চাইলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তার সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করেন:

"কৃষি কোনো হেলাফেলার বিষয় নয়। ব্যাংকের ম্যানেজার হিসেবে আমি শিখেছি— সঠিক পরিকল্পনা, সময়ানুবর্তিতা এবং নিষ্ঠা। এই তিনটি গুণ আমি আমার মাল্টা চাষেও প্রয়োগ করেছি। কখন সার দিতে হবে, কখন কীটনাশক—সব করেছি সময়মতো। দ্বিতীয়ত, আমি শিখেছি ধৈর্য। সফলতার ফল মিষ্টি হয়, তবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।"

তিনি বেকার যুবকদেরও উদ্দেশ্য করে বলেন, "চাকরি জীবনের শেষে হাঁপিয়ে উঠবেন না। যদি এক চিলতে জমিও থাকে, তবে মাটির সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন। মাটি কখনো ঠকায় না। বেকার যুবকদেরও বলছি, সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে এমন সম্ভাবনাময় কৃষিখাতে আসুন।"

সবুজ স্বপ্নযাত্রার উপকথা

সাবেক ব্যাংক ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের এই উদ্যোগ কেবল তার নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেনি, বরং পাটগ্রামের কৃষিক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তার সাফল্য দেখে এলাকার বহু কৃষক এখন গতানুগতিক ফসলের বাইরে এসে মাল্টা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তিনি এখন নিজ উদ্যোগে স্থানীয় চাষিদের পরামর্শদাতা ও অনুপ্রেরণার উৎস।

সবুজ মাল্টার সমারোহে দাঁড়িয়ে থাকা রফিকুল ইসলাম যেন আজ এক ভিন্ন পেশার মানুষ। নিবিষ্ট মনে তিনি তার বাগানের পরিচর্যা করেন, আর তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক পরিতৃপ্তির ছাপ—যেখানে জীবনের দুই অধ্যায়ের সাফল্যের গল্পটি প্রকৃতির মাঝে সার্থক হয়ে উঠেছে। পাটগ্রামের এই মাল্টা বিপ্লব যেন প্রকৃতির কাছে মানব পরিশ্রমের এক উজ্জ্বল উপকথা।

মন্তব্য করুন