প্রকাশিত: ২ ডিসেম্বার, ২০২৫, ১২:৪৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা কি তবে ভুল পথে?

মান না বাড়লেও বেতন চাই: প্রাইমারি শিক্ষকদের আন্দোলনে প্রশ্নের ঝড়

ইমাম ইসরাঈল, লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনার মধ্যেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে টানা আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষক–শিক্ষিকারা। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কোন পথে চলছে?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষিকাদের বেতন–গ্রেড উন্নয়নের দাবিতে চলমান আন্দোলন জোরদার হওয়ায় সারাদেশে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের দাবি— দীর্ঘদিন ধরে তারা বেতন বৈষম্যের শিকার, তাই তাদের গ্রেড উন্নয়নই এখন জরুরি। তবে এই আন্দোলন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে অভিভাবকদের মাঝেও তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি তীব্র প্রশ্ন— ‘শিক্ষার মান যেখানে সন্তোষজনক নয়, সেখানে বারবার বেতন বৃদ্ধির দাবিই বা কেন?’

সরকারি প্রাইমারিতে মান নিয়ে অভিযোগ পুরোনো

শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানের সংকট বহুদিনের। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান:

  • শিক্ষক সংকট
  • অতিরিক্ত ছাত্রসংখ্যা
  • মনিটরিং দুর্বলতা
  • দায়িত্ব পালনে অনিয়ম

অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, সরকারি স্কুলে বেতন–ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা ও বিভিন্ন সুবিধা থাকলেও ফলাফল ও শেখানোর মানের তেমন উন্নতি নেই। তাদের ভাষায়— “যেখানে মান নেই, সেখানে বাড়তি বেতন দিয়ে কী লাভ?”

কম বেতনেও এগিয়ে কিন্ডারগার্টেন

অন্যদিকে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কিন্তু এসব স্কুলে শিশুর শিক্ষা, ক্লাসরুম শৃঙ্খলা ও পড়ানোর মান অধিকাংশ জায়গায় ভালো বলে মনে করেন অভিভাবকরা।

কারণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেন:

  • শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত যথাযথ
  • নিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষক উপস্থিতি
  • অভিভাবকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
  • মালিকপক্ষের দৈনিক মনিটরিং ও জবাবদিহি
  • প্রতিযোগিতার চাপ (যা শিক্ষকদের সক্রিয় রাখে)

ফলে কম সুবিধা নিয়েও এই শিক্ষকরা উচ্চমানের শিক্ষা বজায় রাখছেন বলে মন্তব্য করছেন অভিভাবকরা।

আন্দোলন বাড়ায় নতুন প্রশ্ন

বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকে মনে করছেন, প্রাইমারি শিক্ষকদের দাবি হয়তো যৌক্তিক, কিন্তু শিক্ষার মান না বাড়ালে এ আন্দোলন ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করবে।

শিক্ষা–বিশেষজ্ঞদের মতে, বেতন–গ্রেড বিবেচনার পাশাপাশি শিক্ষক–দায়বদ্ধতা, নিবিড় প্রশিক্ষণ, ক্লাসরুম পর্যবেক্ষণ এবং মান উন্নয়নের বিষয়গুলোকে জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। না হলে কেবল বেতন বৃদ্ধি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং জনমনে অসন্তোষ আরও বাড়বে।

সরকার–শিক্ষক মুখোমুখি, শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত

আন্দোলনের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ বা অনিয়মিত। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। অভিভাবকদের প্রশ্ন— “শিক্ষকের দাবি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের সন্তানের শিক্ষা কি থেমে থাকবে?”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার বেতন–গ্রেড বিষয়ে আলোচনায় বসলেও শিক্ষার মান না বদলালে, শুধু বেতন কাঠামো পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও বৈষম্য তৈরি করবে।

শেষ কথা

একদিকে সরকারি স্কুলে “মান সংকট”, অন্যদিকে বেতন বৃদ্ধির চাপ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বই বর্তমানে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও শিক্ষকদের সম্মিলিতভাবে শিক্ষার মানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মন্তব্য করুন